বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যখাত প্রবঞ্চনা

টাইগার নিউজ

রাষ্ট্রের নিকট জনগণের অন্যতম চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা । স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রের অন্যতম করনীয় চিহ্নিত করার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন প্রকৃত জননায়ক হিসেবে মানুষের এ আকাক্ষা টি বাংলাদেশের সংবিধানে রূপ দান করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুসারে জীবনের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুসারে জনগণের পুষ্টি উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃত। পিতার চেয়ে সন্তানকে তার চেয়েও বেশি কেউ ভালোবাসতে পারে একথা ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করিনা ,যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জাতির জনকের মর্মান্তিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে তারা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য কেউবা “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” কেউ বা “ইসলাম”কে রাষ্ট্রধর্ম বানানো নিয়ে ব্যবসা করেছে। আবার কেউ বা আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ ভারত হয়ে যাবে এই জুজুর ভয় দেখিয়েছে, এদেশের নিরীহ সহজ-সরল স্বশিক্ষিত মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে ক্ষমতায় থেকেছে। এরা দীর্ঘ ক্ষমতার ভোগবিলাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে গর্ব করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় সুদূরপ্রসারি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেনি বা করতে চাইনি। জাতির জনকের হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে জাতির জনকের হত্যার রাষ্ট্রীয় পাপমোচনের পাশাপাশি কিছু যুগান্তকারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করে যার মধ্যে” স্বাস্থ্যনীতি ২০০০” উল্লেখযোগ্য ,যা পরবর্তীতে সংশোধিত পুনঃমূল্যায়ন পূর্বক যুগের চাহিদা অনুযায়ী নবায়ন করে “জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১” প্রণয়ন করা হয় ,যার সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া এবং বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় ৫ ডলার হতে ২৪ ডলারে ২০২১ সালের মধ্যে উন্নীত করা । বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য সে তার জন্মের পর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন দেশ প্রেমিক কোন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পাই নাই যারা তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে । যারা এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন আমার মনে হয় তাদের সকল কাজকর্ম সীমাবদ্ধ ছিল ব্যবসায়িক স্বার্থ নির্ভর, তারা ঐ সমস্ত কাজেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন যেখানে ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হওয়ার সুযোগ ছিল । স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতেও আমরা গর্ব করার মত একটি জাতীয় হাসপাতাল তৈরি করতে পারিনি অথচ এ খাতে খরচ করা হয়েছে লক্ষ কোটি টাকা । আওয়ামী লীগ সরকারের১৯৯৬ থেকে ২০০১ শাসনামলে স্বাস্থ্য খাতের যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল কমিউনিটি ক্লিনিক ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যার আলোকে ওই সময়ে ১০৭২৩ টি কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তোলা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ তার তৃতীয় ও চতুর্থ মেয়াদ এর শাসনামলে আরো ৩৩০০কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করে। মজার ব্যাপার হল আমরা এই কমিউনিটি ক্লিনিকের নামে শুধু জমি অধিগ্রহণ ও শুধু ১৩৫০০ অবকাঠামো বানালাম না তো ?মাঝে মাঝে চিন্তা করি এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যদি আমরা সরকারিভাবে অন্তত চারজন ডাক্তার ও দশটা বেড প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সরকারি ভাবে দিতে পারতাম তাহলে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান কেমন হতো? ভাবতেই ভালো লাগে!আমার জানামতে বাংলাদেশ ডাক্তারি বিদ্যায় ৩৪ ধরনের বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে যার মধ্যে ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ সার্জন রয়েছে 5 ধরনের, যার প্রত্যেকটি ই স্বতন্ত্র । বাংলাদেশে ৪৯২ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৬৪ টি জেলা হাসপাতাল রয়েছে। যেখানে প্রত্যেকটি হাসপাতালে ৫ ধরনের বিশেষজ্ঞ ডেন্টাল সার্জন সহ নিম্নতম ৩৪ ধরনের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র আমাদের ভিন্ন কথা বলে। যার ফলাফল ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর অত্যধিক চাপ ও মানহীন স্বাস্থ্যসেবা । আমি আমার সন্তানের সামনে বলার মত একটি হাসপাতাল খুঁজে পাইনা যেটি নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। এ দায় কার?এদেশের সাধারণ মানুষের ? নাকি আমরা যাদেরকে নেতা মেনে নিয়েছি সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের ? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা জনবলের ক্ষেত্রে বিশ্বের সংকটাপূর্ণ ৫৭ টি দেশের একটি । ডাক্তার ও নার্সের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অনুপাত ১:৩ যেখানে আমাদের অনুপাত ১:০.৪৮। ডাক্তার নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য জনশক্তির স্বীকৃত অনুপাত ১:৩:৫ হলেও আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:১০০০ সে অনুযায়ী আমাদের দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য সাধারণ ডাক্তার প্রয়োজন ১,৮০,০০০ কিন্তু সরকারি ডাক্তার আছে ৩১,০০০(প্রায়) যা প্রয়োজনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত ডেন্টাল সার্জন ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:১০০০০।সে অনুযায়ী আমাদের প্রয়োজন ১৮০০০ ডেন্টাল সার্জন কিন্তু আমাদের দেশের সরকারি ডেন্টাল সার্জন মাত্র ১২৯৬জন! যা প্রয়োজনের মাত্র ১৪ ভাগের ১ ভাগ !এদের আবার অধিকাংশই শহর কেন্দ্রিক । যেকোনো দুর্যোগ এর ভালো খারাপ উভয় দিকই থাকে, বিশ্বব্যাপী এই মহাদুর্যোগ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য সেবার মানহীন ভঙ্গুর অবস্থা। যার দায় ৭৫ পরবর্তী সকল সরকারকেই নিতে হবে। বর্তমানে দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকার তার ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদে ৬৫০০ এমবিবিএস ডাক্তার ও চতুর্থ মেয়াদে ৩৯ তম বিসিএস এর মাধ্যমে আরও ২৫০ জন ডেন্টাল সার্জন সহ ৪৫০০জন এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ দেয় ।কিন্তু COVID-19 এর বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য পরবর্তীতে ৩৯ তম বিসিএস হতে আরো দুই হাজার এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ দেয় এবং আরো দুই হাজার এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা চলছে (সূত্র: জাতীয় দৈনিক )।বিএমডিসির যারা রেজিস্ট্রেশন পায় বাংলাদেশের আইন অনুসারে তারাই ডাক্তার যার মধ্যে এমবিবিএস এবং ডেন্টাল সার্জন উভয়ই অন্তর্ভুক্ত । অথচ আমাদের আমলাতন্ত্র ডাক্তার বলতে শুধু এমবিবিএস ডাক্তারদের কেই বুঝল এবং ডেন্টাল সার্জনদের কে দেশের মানুষের কাছে গুরুত্বহীন ভাবে উপস্থাপন করলো যা রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, সংবিধানের মূলনীতি বিরোধী। অথচ CIVID-19 এ সাসপেক্ট রোগীদের নিকট হতে স্যাম্পল কালেকশন এর জন্য ডেন্টাল সার্জনরা অগ্রগণ্য । দন্ত চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন এত উদাসীন তা আমার বোধগম্য নয় ।১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১২৯৬ জন সরকারি দন্ত চিকিৎসক ? কি হাস্যকর ? দন্ত চিকিৎসা সারা বিশ্বব্যাপী একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থা যা সরকারি সহযোগিতা ছাড়া আমাদের মত একটি দরিদ্র দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয় । যার ফলশ্রুতিতে আমাদের এই সেবা খাত টি তৈরি হয়েছে পুরোপুরি টেকনিশিয়ান বা কুয়াক নির্ভর । যার ফলে আমাদের দেশে মুখগহবরে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার অনেক বেশি এবং যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে যে মানুষটি মনেপ্রাণে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে তার নাম জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা । আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা কতভাবে অপচয় করি,বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী অবৈধভাবে পণ্য ক্রয়ের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে অথচ বছরে অতিরিক্ত মাত্র ২৩০ কোটি টাকা খরচ হবে এই ভয়ে ৬ হাজার ৩৫০ জন চিকিৎসক আমরা নিয়োগ দিতে পারছিনা । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা কি পারিনা স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে অন্তত বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য সেবাকে ঠেলে সাজাতে ? যেখানে অন্তত প্রতি উপজেলায় চারজন ডেন্টাল সার্জন সহ(দন্ত সেবা প্রদানের জন্য ডেন্টাল সার্জনদের নিম্নতম দুইজনের একটি গ্রুপ থাকতে হয়) জনসংখ্যার সংখ্যানুপাতে র ভিত্তিতে অন্তত ৩০০০ মানুষের জন্য একজন এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ করতে এবং সকল সরকারি কর্মকর্তা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দেশের ভিতরেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে। আপনি জানেন যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, অন্তত 39 তম বিসিএস এ উত্তীর্ণ সকল ডাক্তারদের নিয়োগ প্রদান করে এ সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান করা সম্ভব এবং এটা একটি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আপনি জানেন বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে (প্রায়) সবচেয়ে মেধাবী দের একটা বড় অংশই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয় এবং ৩৯ তম বিসিএস এ উত্তীর্ণ সকল ডাক্তার নিঃসন্দেহে মেধাবী দের অন্তর্ভুক্ত, যাদের প্রয়োজন উপযুক্ত সুযোগ ও সঠিক দিক নির্দেশনা সরকারি মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য । যা শুধু আপনার সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমেই করা সম্ভব । স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সবার জন্য নিশ্চিত হোক মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এ প্রত্যাশায় “ভালো থাকুক বাংলাদেশ , ভালো থাকুক বাংলাদেশের ১৮কোটি প্রাণ”

লেখক, প্রকৌশলী মোঃ আসলাম পারভেজ ,সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ। খুলনা বিভাগীয় কমিটি ।ও সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ।

আপনার মতামত



close