প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত আম

টাইগার নিউজ

এ বছর আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে গাছে মুকুলই এসেছিল কম। আবার মুকুল আসার পরপরই শুরু হয় করোনাকাল। তাই অনেকটা অবহেলা আর অযত্নেই এ বছর বেড়ে উঠছে রাজশাহীর আম। পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে গাছের পাতায় সময়মতো ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়নি। প্রয়োজনের সময় গাছের গোড়ায় দেওয়া হয়নি পানি সেচও। এরপরও প্রাকৃতিকভাবে যে ফলন হয়েছে; বলা হচ্ছিল- তা দিয়েই রাজশাহীসহ পুরো দেশের আমের চাহিদা পূরণ সম্ভব। কিন্তু একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উঠতি আমের ফলন। কোনোভাবেই যেন শনির দশা কাটছে না। মৌসুমের শুরু থেকে ঝড়-ঝঞ্ঝা লেগেই আছে। এর ওপর আঘাত হেনেছে সাইক্লোন ‘আম্ফান’। আর আম্ফান যেতে না যেতেই রাজশাহীর ওপর দিয়ে আবারও বয়ে গেছে কালবৈশাখী। হালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে এর ধকল কোনোভাবেই সামলে উঠতে পারছে না রাজশাহীর আম। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এমনিতেই আম বাজারজাত নিয়ে এবার রাজ্যের চিন্তা ভর করেছে আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের ওপর। তার মধ্যে একের পর এক প্রাকৃতিক আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে আমের ফলন। দেশের উপকূলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ আঘাত হানে গত ২০ মে। তবে তাণ্ডব চালায় উত্তরের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও। এরপর আরেক দফায় রাজশাহীর বাগানের আম ঝরায় ২৬ মে রাতের কালবৈশাখী। এই ঝড়ের তাণ্ডবে গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় থাকা বাগানগুলোয় প্রচুর আম ঝরে গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দিন বাগানের কমপক্ষে ২০ ভাগ আম ঝরে গেছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামের আমচাষি আমিনুল ইসলাম। আর পরের কালবৈশাখীতে আরও অন্তত ১০ ভাগ আম ঝরেছে। পর পর দুই দফার ঝড়ে অনেক বাগানের আম ঝরে পড়ায় তিনি লোকসানের আশঙ্কা করছেন এবার। কৃষি বিভাগ বলছে, এই ঝড়-শিলাবৃষ্টির মাঝেই রাজশাহীর আম বেড়ে ওঠে। ক্ষতি খুব একটা হবে না। এরপরও আম্ফানে রাজশাহীর ক্ষতিগ্রস্ত আমবাগান মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ জন্য সরকারের কাছে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১১০ কোটি টাকা চেয়েছে কৃষি বিভাগ। সদ্য সমাপ্ত সাইক্লোন আম্ফানের তাণ্ডবে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় থাকা বাগান থেকে ১৫ শতাংশ আম ঝরে পড়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, পরের কালবৈশাখীতে এত পরিমাণ আম ঝরেনি। দুই দফার ঝড় মিলে মোটের ওপরে রাজশাহীর বাগানগুলোতে প্রায় ১৫ শতাংশ আমই ঝরেছে বলা যায়। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিকদের সরাসরি সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি। তাহলে আশঙ্কিত লোকসান কাটিয়ে তারা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তা না হলে এবার স্থানীয় অনেক আমচাষি ও ব্যবসায়ী পথে বসবেন বলেও মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। আর আম্ফানে বাগানের ১৫ শতাংশ আম ঝরেছে উল্লেখ করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল হক বলেন, পরের ঝড়ে এক শতাংশের বেশি আম ঝরেনি। কেবল পদ্মা নদীর কিনারায় যেসব বাগান আছে, সেখানে কিছু আম ঝরেছে। রাজশাহীর এমন আম ঝড়-শিলাবৃষ্টির মাঝেই টিকে থাকে। তাই আপাতত চাষিরা লোকসানের আশঙ্কা করলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষতি খুব একটা দেখা দেবে না। বাগান থেকে পুরোদমে আম নামানো শুরু হলে আর বাজারে দাম ভালো পেলে চাষিরা লাভ করবেন বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা। এরপরও আম্ফানে রাজশাহীর ক্ষতিগ্রস্ত আম বাগান মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ জন্য সরকারের কাছে ১১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। করোনা পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগ ফসলের ক্ষয়ক্ষতির জরিপ করেছে উল্লেখ করেছেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক। তিনি বলেন, গাছ থেকে পরিপক্ব আম নামানো, বিষমুক্ত আম বাজারজাতকরণ, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আম বিপণন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের জন্য এরই মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। রাজশাহীর প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এখন বিষয়গুলো মনিটরিং করছেন। আর নতুন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে এই ক্ষতি সামলে ওঠা যাবে বলে মনে করছেন তিনি।

আপনার মতামত



close