শীর্ষ সংবাদ :

পাক বাহিনীর টহলের মধ্যেই খুলনায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন হয়

টাইগার নিউজ

DSC_0188শেখ আব্দুল কাইয়ুম :: শহরের সড়কগুলোতে তাক করা মারণাস্ত্র হাতে পাক হানাদার বাহিনীর সর্তক পাহারা। চারিদিকে ভয়ার্ত এক পরিবেশ। সব কিছু উপেক্ষা করে খুলনার অকুতভয় দামাল ছেলেরা জীবনকে তুচ্ছ করে স্বাধীন বাংলার পতাকে হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। বীরদর্পে শহরের শহীদ হাদীস পার্কে জড়ো হয়ে উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলার পতাকা। দিনটি ছিলো ১৯৭১’এ ২৩ মার্চ। গাড় সবুজের মাঝে লাল সূর্যের বৃত্তের মাঝে সোনালী রংয়ের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত নতুন এ পতাকা নিজ হাতে উত্তোলন করতে পেরে গর্বিত।

আগেই কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলার ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ-এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক তৎকালীন ডাকসু-র ভিপি আ স ম আব্দুর রব ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে ছাত্র-গণজমায়েতে প্রথম এ পতাকা উত্তোলন করেন। পরে তা বঙ্গন্ধুর হাতে তুলে দেন। এর পর সিদ্ধান্ত হয় যে, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ দিবস পালন করা হবে এবং সর্বত্র এই পতাকা উত্তোলন করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের জোর প্রস্তুতি চলে। এরই অংশ হিসেবে ২৩ মার্চ’৭১ খুলনায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও জয় বাংলা বাহিনী পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে বাংলাদেশ দিবস পালন করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে জয় বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয় শহরের শহীদ হাদিস পার্কে।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশের অন্যান্য জেলার মত খুলনাতেও গড়েতোলা হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্রলীগের মিলিট্যান্ট গ্রপের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠন করা হয় জয়বাংলা বাহিনী। খুলনায় এই বাহিনীর প্রধান করা হয় আমাকে। প্রসঙ্গত, ১৫ই ফেব্রুয়ারী বাহিনী বা সার্জেন্ট জহুর বাহিনী ঢাকায় গঠিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের মিলিট্যান্ট গ্র্রুপ নিয়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিচার চলাকালীন সময়ে এ মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল ১৫ ই ফেব্রুয়ারী। তারই স্মরণে এই “ফেব্রয়ারী ১৫ বাহিনী” গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তীতে জয়বাংলা বাহিনীতে রুপ লাভ করে। ঐ সময়ে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুশান্ত কুমার নন্দী, আমি ছিলাম যুগ্ম সম্পাদক। ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন সন্ত্রাসীদের বোমায় নিহত সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু।

অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য মার্চের শুরু থেকেই খুলনা শহর ছিল উত্তাল। জনতার মিছিলে-শ্লোগানে সারাদেশের মত খুলনাও ছিল মুখরিত। আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্র লীগ, ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সকল প্রগতিশীল স্বাধীনতাকামি মানুষ এক হয়ে রাজ পথে নেমেছিল। নগরীর দৌলতপুর ও খালিশপুর থেকে ছাত্র শ্রমিক জনতা জঙ্গী মিছিল নিয়ে খুলনার বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়। ৩মার্চ খুলনায় এক বিশাল মিছিলে হানাদার বাহিনী গুলি করে তিন জনকে হত্যা করে। আহত হয় অনেকে। প্রতিবাদে মিছিল কারীরা জঙ্গী¥রূপ নিয়ে শহরের কে.ডি. ঘোষ রোডে অবস্থিত কয়েকটি বন্দুকের দোকান ভেঙে বন্দুক, রাইফেল, গুলি সংগ্রহ করে। এই সংগৃহীত অস্ত্র নিয়ে সেচ্ছাসেবক বাহিনী, জয়বাংলা বাহিনী, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সাথে যৌথভাবে খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-যুবকদেরকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মুক্তকামী জনতা শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়া পাকবাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা হামলার পরিকল্পনা নেয়। এতে শহরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং পাকবাহিনীর হামলার ভয়ে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার দাবীতে খুলনার হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এর ফলে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও জয়বাংলা বাহিনীসহ খুলনার স্বাধীনতা আন্দোলনের মানুষগুলো আরো উৎসাহিত হয়েছিল। মাসব্যাপী এ সকল কর্মসূচীর পাশাপাশিই চলে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস গ্রুপের তথা স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও জয়বাংলা বাহিনীর বাংলাদেশ দিবস পালনের প্রস্তুতি। জয়বাংলা বাহিনীর সদস্যরা খুলনা জিলা স্কুলের মাঠে ২৩শে মার্চ পতাকা উত্তোলনের প্রস্তুতি হিসাবে প্রতিদিন সামরিক কায়দায় মার্চ-পাস্টের প্রাকটিস্ বা মহড়া শুরু করে। এসময় জিলা স্কুলের স্কাউটস্ দলের ব্যান্ড পার্টির সরঞ্জাম সংগ্রহ করে দেয় ঐ স্কুলের ছাত্র সামসুদ্দোহা টিপু। পতাকা উত্তোলনের আয়োজনকে সফল করতে পতাকাকে অভিবাদন জানানোর জন্য জয়বাংলা বাহিনীকে খুলনা জেলা স্কুলের মাঠে স্কাউটের ব্যান্ড পার্টি ডামি রাইফেল দ্বারা বিশেষ প্রশিক্ষনের দায়িত্ব পড়ে আমার উপর।

স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রে বসে লাল-সবুজের পতাকাটির রূপ দান করেন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হলের ১১৮ নং কক্ষে তোফায়েল আহমেদ, কাজী আরিফ আহমেদ, মার্শাল মনি, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, স্বপন চৌধুরী, খসরু মন্টু সহ আরো অনেকে উপস্থিত থেকে পতাকার রূপ দানের চিন্তা করেন। গাড় সবুজের মাঝে লালবৃত্ত-লালবৃত্তের মাঝে সোনালী রঙের পূর্ববাংলার মানচিত্র এটি হবে স্বাধীনতার পতাকা। কিন্তু মানচিত্র অংকন করার তেমন কোন শিল্পী পাওয়া যায়নি। কুমিল্লার ছাত্রলীগ নেতা শিব নারায়ন দাস ভালো শিল্পী ছিলেন। তাকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এনে পতাকার নকশা তৈরীর ব্যবস্থা করা হয়। এটিই ছিল জয়বাংলা বাহিনীর পতাকা যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার পতাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

নতুন এই পতাকার নমুনা ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে দর্জীকে দিয়ে পাঁচশত পতাকার তৈরীর করা হয়। কিন্তু সীমিত পরিমাণ পতাকা খুলনার মানুষের কাছে বিলি করতে গিয়ে কম পড়ে যায়। তখন খুলনা থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত ‘সাপ্তাহিত দেশের ডাক’ পত্রিকায় ছাপানোর জন্য এর সম্পাদক লুর জাহাঙ্গীরকে অনুরোধ করলে তিনি তাঁর পত্রিকার অর্ধপৃষ্ঠা জুড়ে তিন কালারে তা ছাপনোর ব্যবস্থা নেন। ফলে খুলনার সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীন বাংলার পতাকা সম্পর্কে অবহিত হয়।

২৩শে মার্চ সকাল দশটা। সম্পূর্ণ সাদা পোষাকে সুসজ্জিত জয়বাংলা বাহিনীর সদস্যরা শহীদ হদীস পার্কে সামরিক কায়দায় সারিবদ্ধভাবে পতাকা স্ট্যান্ডের সামনে সম্মান দেখাতে দাড়িয়ে। অনুষ্ঠান দেখতে উপস্থিত কয়েকশত মানুষ। আর তখন তাক করা মারণাস্ত্র হাতে পাকবাহিনীর চারিদিকে টহল দিয়ে যাচ্ছিলো। তা সত্বেও আমাদের মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভায় উকি দেয়নি।
–অনুলিখন ঃ সামছুজ্জামান শাহীন।

আপনার মতামত



close