শীর্ষ সংবাদ :

খুলনা বিএনপির সেই দাপুটে রাজনীতিকরা এখন…

টাইগার নিউজ

2_51816সামছুজ্জামান শাহীন :: খুলনার রাজনীতিতে এক সময়ের দাপুটে রাজনীতিক অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী, অ্যাডভোকেট শেখ তৈয়েবুর রহমান ও আশরাফ হোসেন এখন রাজনীতি থেকে অনেক দূরে। এর মধ্যে প্রথম দুই রাজনীতিক বয়সের কারনে নিস্ক্রিয়। অন্যজন এক এগারোর সংস্কারপন্থী হওয়ায় দল থেকে বহিস্কৃত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তাদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে খুলনা বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তাদেরমত দুরদর্শীতা সম্পন্ন প্রজ্ঞাবান প্রভাবশালী রাজনীতিকের শুন্যতা খুলনা বিএনপিতে দৃশ্যমান।
জানা যায়, জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালিন সাবেক সদস্য বর্ষিয়ান পার্লামেন্টেরিয়ান অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী রাজনীতি থেকে নিরবে সরে দাড়িয়েছেন। রাজনৈতিক সহকর্মিদের থেকেও দুরে। অথচ এই মেধাবী রাজনীতিকের বর্ণাঢ্য এক অতিত আছে। জ্ঞানের পরিধিও অনেক বিস্তৃত। চিন্তা শক্তিতে এখনো অন্য দশজনের চেয়ে বেশি শক্ত সামর্থ। তবু কেন রাজনীতি থেকে দুরে সরে থাকা? জবাবে রাজ্জাক আলী বলেন, ‘দেশ গড়ার যে ব্রত নিয়ে রাজনীতিতে পা রেখে ছিলাম, তা থেকে এখনকার রাজনীতিকরা দূরে সরে গেছেন। বর্তমান রাজনীতিতে দুরদর্শীতা ও প্রজ্ঞাবান লোকের বড়ই অভাব। যা দেখে দুঃখ পাই। ব্যথিত হই।’
প্রবীন এই রাজনীতিকের হাতে খড়ি আজীবন লাড়াকু সৈনিক মাওলা ভাসানীর হাতে। ন্যাপে যুক্ত হয়ে রাজনীতি শুরু করেন। বিভাজনের কারন ৬৪ সালে ন্যাপ ছাড়েন। ৭৩ এ জাতীয় নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনে জাসদ’র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। ৭৮ সালে বিচারপতি ছাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত জাগো দলের ফাউন্ডার মেম্বর হন। ৮৯ তে জাগোদলের নাম পরিবতন করে বিএনপি করা হয়। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ৯১ ও ৯৬ এর জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচনে খুলনা-৬ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। এই সময়ের মধ্যে তিনি আইন প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্জাক আলী ২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি ছেড়ে কর্ণেল অলি আহমেদের সঙ্গে এলডিপি গড়েন। কিন্তু কিছুদিন পরওই ওই দল থেকে সরে আসেন। সেই থেকেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। রাজনীতিতে ফিরবেন কি না জানতে চাইলে প্রবীন এই রাজনীতিক বলেন, এখন ৮৪ বছরে পা দিয়েছি। এই বয়সে মাঠে মিছিল মিটিং এ সক্রিয় থাকার শক্তি ও সামর্থ নেই। তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে কেউ সহয়তা চাইলে প্রস্তুত আছি। সাবেক স্পিকার রাজ্জাক আলীর স্বেচ্ছায় নেয়া অবসর কাটছে পত্রিকা, বই পড়ে ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা ঘটনা লিখে। ইতোমধ্যে ‘চেয়ারের অন্তরালে’ নামে একটি বইয়ের পান্ডুলিপি লেখা শেষ করেছেন। তাতে তার জীবনে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও পরাষ্ট্র বিষয়ে অসংখ্য অজানা ঘটনার উল্লেখ থাকছে।
অ্যাডভোকেট শেখ তৈয়েবুর রহমান : একটানা বিশ বছর রাষ্ট্রীয় পতাকা বহনকারী খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট শেখ তৈয়েবুর রহমানের শরীরে নানা অসুখ বাসা বেঁধেছে। একাকী চলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি খুলনায় বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে যৌবনের অনেক সময় ব্যয় করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপিতেই আছেন এমনটি মনে করেন তৈয়েবুর রহমান। এক সময়ের দাপুটে এই রাজনীতিক এক প্রকার নিভৃতে খুলনা শহরের ১৫/১ গগন বাবু রোডে নিজ বাড়িতেই স্ত্রীকে নিয়ে বাস করছেন।
তৈয়েবুর রহমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। ৬৫ সালে ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ন্যাপের খুলনা জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আইন পেশার কারনে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। প্রতিষ্ঠাকালিন সময় থেকে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি খুলনায় বিএনপির ঘাটি গড়তে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তার হাতে গড়া অনেক রাজনৈতিক নেতাই এখন খুলনা বিএনপিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অথচ জীবনের সায়েহ্নে এসে কেউ তার খোজ রাখছে না।
২০০৭ সালে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ সালের ১৫ ডিসেম্বর খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনোনিত হন। সেই থেকে ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত একটানা প্রায় ১৭ বছরের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সেনেগালের রাষ্ট্রদূত হন। তিনি নিটক অতীতে খুলনার রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ কমিশনারই ছিল অনুসারী। তার রাজনৈতিক জীবনে নির্বাচন করে পরাজয়ের কোন রেকর্ড নেই। দেশে সম্ভাবত তিনিই একমাত্র বিএনপির নেতা, যিনি একটানা প্রায় ১৯ বছর ধরে রাষ্ট্রিয় পতাকা বহন করেছেন। ওয়াল ইলেভেনের সময় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করা তৈয়েবুর রহমানের বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ছন্দপতন ঘটে। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরে যান তিনি। অবশ্য এ বিষয়ে তৈয়েবুর রহমানের দাবি হচ্ছে, তৎকালিন সামরিক সরকারের লিখিত বক্তব্যই তাকে দিয়ে বলানো হয়েছিলো।
২০০৭ সালের ২ নভেম্বর ওয়ান ইলেভেনের সময় খুলনা মেয়রের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন তৈয়েবুর রহমান। তাকে মাদকদ্রব্যসহ নানা অভিযোগের ১৫টি মামলার আসামী করা হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় তার ৫ বছর করে সাজা হয়। বর্তমানে সবগুলো মামলা থেকে জামিনে আছেন। এ প্রসঙ্গে তৈয়েবুর রহমানের স্ত্রী লায়লা বেগম বলেন, ‘তৈয়েবুর রহমান যদি দুর্নীতিবাজই হবে তাহলে এখন কেন অর্থাভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে পারছি না?’
আশরাফ হোসেন : শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে এক সময়ের রাজপথ কাঁপানো উচুকণ্ঠ বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন এখন রাজনীতিতে একেবারেই নিরব। বিএনপি থেকে বহিস্কৃত হয়ে ঘরমুখো হয়ে গেছেন। ভিন্ন কোন দলেও যোগ দেননি। বেশিরভাগ সময় কাটছে ঘনিষ্টজনদের নিয়েই। তবে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষè দৃষ্টি আছে বলে জানালেন শ্রমিক নেতা আশরাফ হোসেন। তিনি বলেন, দেশে এখন চলছে প্রতিহিংসার রাজনীতি। চাটুকর ও দুর্বৃত্তরা রাজনীতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। কালো টাকার কাছে সকলেই জিম্মি। ফলে প্রতিবাদী প্রকৃত ত্যাগী রাজীনতিকরা ছিটকে পড়ছে। বর্তমানে জনগনের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গনতান্ত্রিক অধিকার নিরাপদ নয়।
জানা যায়, সংস্কারপন্থী খ্যাত সাবেক এই বিএনপি নেতা আশরাফ হোসেন শ্রমিকদে নেতৃত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার পর তৎকালিন পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশনের ইষ্ট পাকিস্তানের যুগ্ম সম্পাদক হন। এর আগে কুমিল্লা ভিক্টরিয়া কলেজের ছাত্র সংসদে দুই বার নির্বাচিত সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৩ সালে মজদুর ফেডারেশনের সিদ্ধান্তে খুলনা আসেন। এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার পক্ষে রাজপথে সোচ্চার হন। ১৯৬৯ এ প্রগতিলীগে যুক্ত হন। এর পর প্রতিষ্ঠার সময়ে বিএনপিতে যোগ দেন। বহিস্কারের আগ পর্যন্ত ওই দলের যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করেন।
আশরাফ হোসেন বলেন, মূলত গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পথে দলকে পরিচালনার কথা বলে বহিস্কৃত হয়েছিলাম। বিএনপি ও আওয়ামীলীগে গনতন্ত্রের চর্চা নেই। দুই দলের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্যও নেই। এরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না। কিন্তু জনগনকে আইনের দ্বারা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তারা ক্ষমতায় গেলেই আইনের উর্দ্বে উঠে যায়। বর্তমানে দেশে আইনের শাসন নেই। আগেও ছিলো না।
সাবেক হুইপ বলেন, রাজতন্ত্রের বিকল্পই হলো গনতন্ত্র। গনতন্ত্র ব্যবস্থায় জনগন কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই জনকল্যানে নিবেদিত হয়ে গনতন্ত্র ব্যবস্থা মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। রাজনৈতিক দল গনতন্ত্রের অন্যতম নেয়ামক। সেই দলগুলোতেই গনতন্ত্র নেই। জনগনকে গনতন্ত্রর স্বাদ দিতে হলে আগে দলের মধ্যে গনতন্ত্রের চর্চা করতে হবে।

আপনার মতামত



close